বিবর্তন | আবুল হাসনাত বাঁধন

বিবর্তন

83 / 100

বিবর্তন | আবুল হাসনাত বাঁধন

এক.

বিয়ে হয়েছে সাত দিন হয়ে গেল। এখনো আমার বউয়ের কাছেও ঘেঁষিনি। একটা কথাও বলিনি ওর সাথে। মা-বাবার পছন্দ মতোই বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বিধাতার নির্মম পরিহাস। বউ হিসেবে আমার কপালে যে জুটল সে ছিল আমার ভালোবাসা আর ঘৃণার সংমিশ্রণ। একসময় সে আমার সবকিছু ছিল। হঠাৎ একদিন তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেই মেয়েটিই এখন আমার বউ। কী করব? ভালোবাসবো নাকি সারাজীবন ঘৃণা করে যাব তাকে? তবে সে আমাকে কোনো দিন গ্রহণ করে নেবে বলে মনে হয় না।

অনেক অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন একটা কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে পড়তাম। রোল ছিল এক। ক্লাস টু’র বার্ষিক পরীক্ষায় এক স্যার পক্ষপাতিত্ব করে আমাকে রোল দুই বানিয়ে দিলো। ব্যাপারটা আমার আম্মা জানার পর ভীষণ চটে গেলেন। সেদিনের পর আর কখনো ওই স্কুলে যাইনি। আমাকে ভর্তি করানো হলো উপজেলার সবচেয়ে সেরা স্কুলে। ওইটাই বোধ হয় আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

ভর্তি পরীক্ষায় আমি ১ম হয়েছিলাম বলে “ক” সেকশনে চান্স পেলাম। যেদিন প্রথম নতুন স্কুলে যাব, সেদিন সকালে উঠে দেখি আমার বসন্ত উঠেছে। ছয় দিন পড়ে রইলাম বিছানায়। সপ্তম দিন সুস্থ হলাম। সেদিনই প্রথম নতুন স্কুলে গিয়েছিলাম। নতুন জায়গা নতুন মানুষ, আমার কোনো বন্ধু নেই। ক্লাসের এক কোনায় বসে পড়লাম। কেউ কথা বলল না। যে যার মতোই আছে। এত মানুষের ভিড়ে শুধু আমিই একা। ক্লাস টিচার এসে নাম ডাকা শুরু করলেন।

আমার রোল সবার শেষে। তাই বসে বসে বাইরের প্রকৃতি দেখছিলাম জানালা দিয়ে। খোলা মাঠ। মাঠে প্রচুর ঘাস। জানালার কাছেই একটা পেয়ারা গাছ। তার কিছু দূরেই পাশাপাশি দুটো নারিকেল গাছ। বসন্তের হাওয়ায় ডালপালাগুলো মৃদু দুলছে। সেই হাওয়ারাই আমার জীবনে প্রথম ভালোবাসা নিয়ে আসলো। শুরুর দিকে অনেকগুলো ছেলের নাম ডাকার পর, ম্যাডাম প্রথম যেই মেয়েটির নাম ডাকলেন; কেন জানি তাকে দেখতে ইচ্ছে হলো। জানালা থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েদের ফার্স্ট বেঞ্চে নিলাম। অপূর্ব নিসর্গ থেকে বেরিয়ে এসে যেন স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ডুব দিলাম।

#আরও পড়ুন » সেরা ৪টি ভিডিয়ো ইডিটিং অ্যাপ্লিকেশন!

আট বছরের কিশোরী। বয়সের তুলনায় খানিকটা লম্বা। ক্লাসের অন্যদের চাইতে লম্বা চুল তার। রেশমি কালো চুলগুলো কোমর সমান লম্বা। গোলাকার মুখটাতে, দুটো টানা টানা কাজল কালো চোখ। কালো চোখের নীলচে মণিতে আমার স্বপ্নের আকাশ দেখা যায়। যে আকাশে আমি চাইলে সারাজীবন মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াতে পারব। মুখের বাম পাশে একটা কালো তিল। মুখে তিলওয়ালা মেয়েরা অজানা কারণে ফর্সা হয়। ওর ফর্সা মুখখানায় কেমন জানি মায়া মায়া ভাব। দেখলেই মোহাবিষ্ট না হয়ে পারা যায় না। আমি তার গলার ওপরের অংশ ছাড়া দেহের অন্য কোনো অংশে কোনোদিনও তাকাইনি। আমার সবচেয়ে প্রিয় অংশ ছিল- তার কোমর সমান লম্বা, রেশমি কালো চুল গুলো। সামনের খোলা চুল গুলো যখন বাতাসে উড়ত, আমি তখন অন্য ভুবনে হারিয়ে যেতাম। হয়তো দূরে কোথাও ভালোবাসা নামক গ্রহে অথবা ক্রাশ নামক গ্যালাক্সিতে।

স্কুলের প্রথম দিনে ম্যাডাম নাম ডাকার সময় প্রথম যখন আমি তার দিকে তাকালাম, ঠিক সেই মুহূর্তেই বসন্তের দক্ষিণা হাওয়া এসে তার সামনের খোলা চুল গুলো উড়িয়ে কপালটা ঢেকে দিলো। সে বারবার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বাধে বাকি চারটে আঙুল দিয়ে চুলগুলো কানের সাথে আটকাচ্ছিল। আমি নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। মনে মনে হয়তো বলেছিলাম, ‘ওগুলো উড়তে দাও, ওগুলো উড়লে তোমায় স্বর্গের অপ্সরীর মতো লাগে।’ হয়তো আমার মনের কথা তার কান পর্যন্ত পৌঁছোয়নি। তখনো ভালোবাসা বুঝার বয়স হয়নি। কিন্তু না বুঝেই তাকে ঘিরে আমার পৃথিবী সাজিয়েছিলাম। ক্লাসের এক কোনায় বসে প্রতিদিন চুপিচুপি দেখতাম তাকে। কেউ বুঝত না। কেউ জানত না। একা একা পথ চলতাম আমি। মাঝে মাঝে তার চোখে আকাশ দেখতাম। রেশমি কালো চুলের মাঝে অরণ্য খুঁজতাম। তাকে নিয়েই তৈরি হয়েছিল আমার কল্পনার জগৎ।

ঘড়ির কাঁটা নিরন্তর ঘুরে চলল বৃত্তাকারে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, যুগ পেরুল। তবুও আমার ভালোবাসা কমলো না। বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। কিন্তু সে কখনো আমাকে গ্রহণ করেনি। কলেজে উঠে একবার বলেও দিলাম ভালোবাসার কথাটা। বহুদিন ধরে মনের ভেতরে জমানো কথাটা বাইরে বেরুল। যেন বহুকাল পরে খাঁচায় বন্দি পাখিটা হঠাৎ মুক্তি পেয়েছে। এবার সে উড়বে। সাদা মেঘ ভেসে বেড়ানো নীল আকাশে ডানা মেলে সে সানন্দে উড়বে। হারিয়ে যাবে কোনো অরণ্যে। কিন্তু আমার আশায় সব সময় গুঁড়েবালি হয়। সে কোনো উত্তরই দিলো না। বরং অবহেলার মাত্রাটা বাড়িয়ে দিলো।

কোনো কিছু প্রতিনিয়ত চলতে থাকলে স্বাভাবিক ভাবেই সে জিনিসটার প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা চলে আসে। এক্ষেত্রেও তাই হলো। প্রতিনিয়ত তার অবহেলা আমার প্রতি পদে পদে সুঁচের মতো বিঁধত। এক সময় আমার মনে ঘৃণা জন্মাল। প্রচণ্ড ঘৃণা তার জন্য। সব স্মৃতি মুছে দিলাম ওর। এক সময় এই স্মৃতিগুলোই আঁকড়ে ধরে আমি বাঁচতাম। কিন্তু দেখলাম সেগুলো মুছে দিয়ে আমি মারা যাইনি। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ছন্নছাড়া জীবনটা সাজাতে। আসলে সাজাতে জানলে জীবন অনেক সুন্দর। আমিও সেই সৌন্দর্য মুঠোয় পুরে উপভোগ করেছিলাম। সময়ের স্রোতে সে হারিয়ে গিয়েছিল। আমিও কখনো খুঁজতে চেষ্টা করিনি। কিন্তু জীবন বড়োই অদ্ভুত। বিধাতার লীলা বুঝা বড়ো দায়।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বের হয়ে বড়ো একটা কোম্পানিতে চাকরি পেলাম। আমাদের দেশে মেডিকেল আর ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে অনেক টাকা। এই কারণে বোধ হয়, ছোটোকাল থেকে ছেলে-মেয়েদের ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর জন্য মা বাবারা অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে থাকেন। সবাই জানেন কয়েক বছর পর বিনিয়োগের চেয়ে অনেক গুণ বেশি লাভ পাওয়া যাবে। আমাদেরও টাকার অভাব ছিল না। গ্রামে একটা ঘর তুললাম। পাকা না। মাটি আর বেড়ার তৈরি। পাকা ঘরে থাকতে থাকতে যান্ত্রিক মানুষ হয়ে গেছি। তাই মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে খাঁটি মাটির মানুষ হয়ে নির্মল হাওয়া খাওয়ার জন্যে মাটির ঘর তুলেছিলাম। শহরে একটা ফ্ল্যাটও কিনলাম। অনেক বড়ো। চার-পাঁচটা রুম খালিই পড়ে থাকে। বছর খানেক পরেই আম্মা উঠেপড়ে লাগলেন আমার বিয়ের জন্য। আমিও সায় দিলাম।

#আরও পড়ুন » ‘অনিন্দ্য রায় : আমি কি জল হয়ে যাব?’

আম্মা প্রতিদিনই মেয়ে দেখতেন। একদিনে চার পাঁচটা পর্যন্তও দেখেছেন। হয় ছৈয়দ বংশ, খন্দকারের মেয়ে না, না হয় চুল বেটে, চোখ বড়ো, নাক মোটা, ফর্সা না, ঠোঁট বড়ো, এই সেই কোনো মতেই আম্মা মেয়ে মিলাতে পারতেন না। তবে আমি কোনো দিন মেয়ে দেখতে যাইনি। আম্মা যাকেই পছন্দ করবেন তাকেই বিয়ে করব আগেই বলে দিয়েছিলাম। মাস খানেক পর আম্মা পেয়ে গেলেন একজনকে। তাকে খুব পছন্দ হলো আম্মার। সাফ বলে দিলেন, ছেলের বউ হিসেবে তাকেই আনবেন। যেভাবেই হোক। যেহেতু বিয়ে নিয়ে আমার এত কৌতূহল ছিল না, তাই আম্মার আশা ভঙ্গ করিনি। বিয়েটা পাকাপাকি হয়ে গেল। আম্মাকে এত খুশি হতে আগে কখনো দেখিনি। শেষবার উনাকে এত উৎফুল্ল হতে দেখেছিলাম যেদিন আমি বুয়েটে চান্স পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু এবার অনেকগুন বেশি হাসিখুশি দেখাচ্ছে উনাকে।

আম্মা সব কাজ তদারকিতে ব্যস্ত ছিলেন। আব্বার কোনো কাজ নেই। উনি শুধু সবাইকে নিয়ে গল্পগুজব করতেন। বিয়ের দু’সপ্তাহ আগে থেকেই বাড়িতে উৎসবের ধুম পড়ে গেল। আম্মা থাকতেন চাচি, মামি, খালাদের নিয়ে। বাসায় ছোটো বড়ো সবাই যে যার মতো আনন্দে মেতেছিল। শুধু আমি নিশ্চুপ। বিয়ে বাড়ির দৃশ্য আমার জন্য নতুন নয়। মামা, চাচাদের বিয়েতে আমিও ছোটো শিশু, কিশোর কিংবা যুবক ছিলাম। বিয়ে বাড়ির অভিজ্ঞতা তাই আমার আছে। কিন্তু জীবনের অনেক ধাপ পেরিয়ে এবার আমি বরের আসনে। নিজের রুমে একা একা বই পড়েছি বিয়ের আগের দিনগুলোতে। অফিস থেকে একমাসের জন্য ছুটি নিয়েছিলাম। এখনো শেষ হয়নি ছুটি। আকদের আগ পর্যন্ত আমি কনেকে সচক্ষে দেখিনি। শুধু আমার বোনের কাছে একবার বর্ণনা শুনেছিলাম একটু করে। ভাবীকে দেখে এসে রাত্রি খুব আনন্দিত হয়ে আমাকে বলেছিল, ‘ভাইয়া জানিস? ভাবী দেখতে চরম সুন্দরী! পুরা জীবন্ত পরি। কোমর সমান লম্বা চুল। টানা টানা চোখ। গোলাকার ফর্সা মুখ। মুখে একটা তিল আছে। দেখলে হাঁ করে থাকবি তুই!’

আমি সেদিন ওর কথায় কান দিইনি। আমার পোড়ামনে একবারের জন্যেও কল্পিত হয়নি ছোটোবেলার সেই স্বপ্নপরিকে। উদাসীন মনে একবারও এই বোধ জাগ্রত হয়নি যে, কয়েকদিন পরেই আমি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। অজানা কেউ একজনের সাথে জন্ম জন্মান্তরের বন্ধনে আবদ্ধ হবো। দায়িত্ব বাড়ছে আমার। ভালোবাসা আর পরিবারের দায়িত্ব। সেদিনও আমি নিষ্প্রভ ছিলাম। একা রুমে বসে বসে উপন্যাস পড়ে শেষ করতাম একটার পর একটা। অথচ আমাদের জীবন এক একটা উপন্যাস। জন্ম দিয়ে উপন্যাসের শুরু আর মৃত্যু দিয়ে শেষ। শিক্ষা, চাকুরি, প্রেম, বিয়ে, সংসার এগুলো একেকটা বিষয়বস্তু। আর আমরা সবাই-ই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। রুমের মধ্যে একটা আদিম নৈঃশব্দ্যিক পরিবেশ সর্বদা আমাকে বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝে আটকে রাখত। কিছুতেই ফিরে যেতে দিত না অতীতে। আমি থাকতাম বিয়ে বাড়ির কোলাহল থেকে অনেক অনেক দূরে। উপন্যাসের শাব্দিক ইন্দ্রজালে আটকে গিয়ে বিয়ে বাড়ির গান-বাজনা, হাসাহাসি, উৎসবমুখর হাটের শব্দ রুমে প্রবেশ করতে পারত না।

রাত্রির কথা-ই সত্য প্রমাণিত হলো। আকদের দিন কনেকে দেখে ‘থ’ বনে গেলাম। তবে তার রূপ দেখে নয়। কারণ এই মায়াবী রূপ আমার অচেনা নয়। সব স্পষ্টই মনে আছে আমার। এ যে আমার ছোট্টবেলার সেই মায়াবতী! কোমর সমান লম্বা রেশমি কালো চুল। গোলাকার মুখটাতে, দুটো টানা টানা কাজল কালো চোখ। কালো চোখের ঠিক মাঝখানে নীলচে মণি। মুখের বাম পাশে একটা কালো তিল। এত বছরে একটুও বদলায়নি তানিয়া। সেই আগের মতোই হৃদয়হরিণী থেকে গেছে। মনে হলো আমার আশে পাশে কোথাও আমার প্রিয় গানটা বাজছে-
মায়াবন বিহারীনি হরিণী
গহন স্বপন সঞ্চারিনী।।

ওকে দেখার পর থেকেই নিজের ভেতর অস্থিরতা অনুভব করলাম। হয়তো জীবনে আরও একবার তানিয়ার প্রেমে পড়ে ভালোবাসার সাগরে ডুব দিলাম। একটু পরেই মনে পড়ল, ওর অবহেলার কথা। যে অবহেলা তিল তিল করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল আমাকে। “সাজিদ” নাম শুনে হুট করে কল কেটে দেওয়া, এরপর শত শত কল রিসিভ না করা, অনেক অনেক মেসেজের একটাও রিপ্লাই না দেওয়া, এসব কথা আমার দ্বিতীয় বার জন্মানো ভালোবাসার ভ্রণটাকে মুহূর্তেই হত্যা করল।

তানিয়ার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম। আকদ সম্পন্ন হলো। তানিয়া সারাজীবনের জন্য ধর্মীয় ও সামাজিক বৈধ রীতিনীতি অনুসারে আমার স্ত্রী হয়ে গেল। আনুষ্ঠানিক বিয়ে আরও দু-তিন দিন পর। আমাদের দেশে আনুষ্ঠানিক বিয়ে মানে হলো, ‘বিয়ের আগের দিন রাতে বর কনের হাতে মেহেদি লাগায়। মেহেদি রাতে কেউ কেউ কেক কাটে, অনেকে গান-বাজনা, নাচানাচি করে। পরদিন সকালে সবাইকে মাছ, মাংস দিয়ে পোলাও খাওয়ানো হয়। সবশেষে ক্লাব থেকে গাড়িতে করে কনেকে বরের বাড়ি নিয়ে আসা হয়। এরপর প্রত্যেক নারী-পুরুষের সেই বহুকালের প্রতীক্ষার অবসান। বাসর রাত। বর কনে দুজনে মেতে থাকে ভালোবাসার বাহ্যিক রূপের উষ্ণতায়।’

আমি আকদের দিনই ভেবে নিয়েছিলাম, তানিয়ার প্রতি কখনো কোনো অধিকার খাটাব না। আমাদের আনুষ্ঠানিক বিয়েও শেষ হলো। তানিয়াও চলে আসলো আমাদের বাড়িতে। রাতে আমাদের থাকতে দিলো লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো বিছানায়। এত ফুল দিয়ে রুমটা সাজানো হয়েছিল যে প্রথমে আমি নিজের রুম নিজেই চিনতে পারিনি। ফুলশয্যায় ঘুমোল তানিয়া। আমি উপন্যাসের বই পড়তে পড়তে শোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কেউ কারও সাথে কথাও বলিনি। হয়তো আমাদেরটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত বাসর রাত। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সবাই আবার যে যার মতো হাসি তামাশায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমরা দুজনের প্রতি বাসার কারও নজর পড়েনি। আসলে বিয়ে হয় বর-কনের, বর-কনেকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এটা পারিবারিক উৎসব। বর কনে এখানে তুচ্ছ। বাকিরাই মুখ্য এই অনুষ্ঠানে। যারা পালিয়ে বিয়ে করে তারা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। দুইজনে একা একা সুখী হতে চায়। কিন্তু পারিবারিক বিয়েতে যে কত সুখ, অনেক মানুষের ভালোবাসা, আশা, আনন্দ; তা তারা বোঝার সুযোগ পায় না।

আমি আর তানিয়া দুজন দু মেরুতে অবস্থান করেও সুখী ছিলাম। কারণ আমাদের দুজনের পরিবার আর আত্মীয়স্বজনরা সবাই মিলে গত কয়েকদিনে অনেক অসাধারণ মুহূর্ত কাটিয়েছেন। হয়তো বিয়ের সিডিতে, ক্যামেরার ছবিতে, অনেকের কম্পিউটারের ফোল্ডারে আজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে সেগুলো। এতসব কোলাহল সবকিছুই আমাদের কেন্দ্র করে। কিন্তু আমরা দুজন নিশ্চুপ, নিস্পৃহ। সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় একবার দেখেছিলাম তানিয়াকে। হালকা হলুদ রঙের সূতির শাড়ি পরেছে। আমার পিচ্চি, পুচকি ভাই-বোনদের সাথে ছিল। ওদের সব উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু তখন তানিয়া। তানিয়া মলিন হাসি দিয়ে ওদের সাথে তাল মিলাচ্ছিল। আমার দিকে চেয়েও দেখেনি। আমি অল্প করে খেয়ে রুমে ফিরে আসলাম। আবার ডুব দিলাম বইয়ের রাজ্যে। “কপালকুণ্ডলা” উপন্যাসটা পড়া শুরু করলাম। সারাদিনে একবারের জন্যেও রুমে আসেনি তানিয়া। দুপুরে আম্মা ডেকে বলেছিলেন, ‘সাজিদ, খাইতে আয় বাবা’। আমি, ‘আসছি’ বলেও গেলাম অনেক পরে। সবার খাওয়া তখন শেষ। সন্ধ্যায় ছোটো বোন রাত্রি আমার রুমে এসে চা নাস্তা দিয়ে গিয়েছিল। রাতে কাউকে খাবার এনে দিতে কিংবা ডাকতে হয়নি। উপন্যাস পড়া শেষ করে আমি নিজেই গিয়েছিলাম খেতে। খেয়ে এসে শোফায় ঘুমিয়ে পড়লাম। তানিয়া কখন এসেছিল জানি না। আগের রাতের মতোই সে বিছানায় ঘুমোল।

পরপর ছ’দিন একই রুটিনে, একই ভাবে কেটেছে আমাদের। আমার ৬টা উপন্যাস পড়া শেষ। তানিয়ার সাথে এখনো কথা বলিনি। সেও বলেনি। শেষবার তার সাথে কথা হয়েছিল কলেজে পড়ার সময়। এরপর কত বছর কেটে গেল। আজ বিয়ের ৭ম দিন। বাসার আত্মীয়স্বজন কয়েকজন বাদে যার যার বাড়ি চলে গেছে। আমাদের বাড়িটা অনেকদিন পর খানিকটা নিশ্চুপ, থমথমে হয়ে আছে। অনেকদিনের কোলাহল থেমে গিয়ে শান্ত হওয়ায় বাড়িটাকে রহস্যময় মনে হচ্ছে। যেন বর্ষণমুখর রাতের শেষে, সকালে পরিষ্কার আকাশে রোদ উঠেছে। ঝলমল করছে তীব্র হলুদ রোদ। রাতের বাজ পড়ার গুড়ুমগুড়ুম শব্দগুলো আর নেই। আজকে তানিয়াকে নাইঅর নেবার কথা। ‘নতুন বউকে বিয়ের কদিন পর বাপের বাড়ি নেওয়াকে নাইঅর বলে।’ আমাদের গ্রাম্য ভাষায় বলে – “ফেরাফেরি”। আমাকেও যেতে হবে তানিয়ার সাথে।

সাফিন, রাত্রি, আমি, তানিয়া আর তানিয়ার ছোটো ভাই তৌফিক। পাঁচ জনে একসাথে যাচ্ছি। আমার ছোটো ভাই সাফিন আর তানিয়ার ভাই তৌফিক সমবয়সী। দুজনের গলায় গলায় ভাব। গাড়িতে ওরা দুজনেই গল্পগুজব করতে ব্যস্ত। বাকিরা চুপচাপ। আমি জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছি। রাস্তার পাশের গাছপালা, মানুষজন দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। তানিয়া আমার পাশে বসা। অজানা কারণে তিনবার চোখাচোখি হয়েছে ওর সাথে। তানিয়াদের বাড়ি বেশি দূরে না। স্কুলে পড়ার সময় একবার গিয়েছিলাম ওদের এলাকায়। বেশ মনে আছে আমার। একটু পরেই পৌঁছে যাব ওদের বাড়ি। আমাদের গাড়ি ছুটছে আপন গতিতে।

দুই.

কয়েকদিন বেশ ভালোই কাটল শ্বশুর বাড়িতে। খাতির যত্নের কোনো কমতি রাখেনি তানিয়ার মা বাবা। সচরাচর নতুন জামাইকে যে খাতির যত্ন করা হয় আমাদের দেশে, তার চেয়ে অনেক বেশিই করেছে। হয়তো আমি তাদের বড়ো জামাই বলেই। তিন বোনের মধ্যে তানিয়াই সবার বড়ো। ওরা তিন বোন, এক ভাই। তানিয়ার পরে সায়লা আর জেনিয়া। তৌফিক সবার ছোটো। ওদের বাড়িতে ঢুকার পর থেকেই সায়লা আর জেনিয়া আমরা ভাই বোন তিন জনের খাতির যত্নে লেগে গিয়েছিল। তানিয়ার আম্মা কিছুক্ষণ পর পরেই এটা ওটা খাওয়াতে খাওয়াতে অস্থির করে তুলেছিলেন আমাদেরকে।

তিনি পরম নির্ভরতায় মেয়ের হাত তুলে দিয়েছিলেন আমাকে। আমাদের সমাজে তানিয়ার বয়সী কাউকে বিয়ে হতে দেখিনি। বিশ পেরুলেই মেয়েদের বিয়ের জন্য মা-বাবারা অস্থির হয়ে যান। অনেকের তো আঠারোর আগেই বিয়ে হয়ে যায়। সাধারণত মেয়ের চেয়ে মেয়ের জামাই এর বয়স অনেক বেশি হয়। কিন্তু আমি আর তানিয়া প্রায় সমবয়সী। সায়লার কাছে জানলাম, তানিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সে মাস্টার্স করেছে। ওর পরিবার শিক্ষিত। পড়াশুনার মর্ম বুঝে। তাই বিয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়নি মেয়ের ওপর। তাকে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ দিয়েছে।

ওদের বাড়িতেই ঘটেছিল অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি। রাতে খাওয়ার জন্য তানিয়ার আম্মা আমাকে ডাকতে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং তানিয়াকেই। আমি রুমের ভেতর হালকা ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। প্রথমে ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলাম স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু না! পরক্ষণে স্পষ্টই শুনতে পেলাম তানিয়ার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর, ‘সাজিদ, আম্মু খেতে ডাকছে। আসো।’ আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কোনো কথা না বলে চুপচাপ তানিয়ার পেছনে হাঁটা শুরু করলাম। মনে হলো, বহুদিন পর বসন্তের শেষ দিকে কোকিলের ডাক শুনেছি। শুষ্ক মরুর বুকে বহুকাল পরে একটা সবুজ উদ্ভিদ গজিয়েছে। আমি জানতাম, সময়ের সাথে মানুষের মনেরও বিবর্তন ঘটে। এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবলাম, তানিয়ার মনের বিবর্তন প্রক্রিয়া কি শুরু হয়ে গেছে?

এরপর নানা দরকারে তানিয়া একটু আধটু কথা বলেছিল। যতদিন ওদের বাড়িতে ছিলাম ততদিন। আমি কোনো কথা বলতাম না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতাম। মনে হতো, নিজের বাড়িতে মা-বাবা, ভাই-বোনকে দেখাতে ও আমার সাথে কথা বলছে। আমাদের বাড়িতে ফিরে গিয়ে আবার আগের মতো হয়ে যাবে সবকিছু। তাই আমি ওর কথার মধ্যে বৃথা ভালোবাসা খুঁজতাম না। মাঝে মাঝে চেষ্টা করতাম অতীতে ফিরে যেতে। ‘সেই ছোট্টবেলা। সেই বসন্ত। তানিয়ার হাওয়ায় উড়া চুল। স্কুলের পেয়ারা আর নারিকেল গাছ।’ কিন্তু কিছুতেই পারতাম না। বরবরের মতোই আটকে থাকতাম বর্তমান আর ভবিষ্যতে। কয়েকদিন পর সবাই চলে আসলাম তানিয়াদের বাড়ি থেকে।

#আরও পড়ুন » টেকনিক্যাল বনাম অনপেইজ এসইও!

আসার সময় তানিয়া গাড়ির মধ্যে ঝিমোতে ঝিমোতে আমার পাশে ঝুঁকে পড়েছিল। একটু পরে আমার কাঁধের ওপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পরম নিশ্চিন্তে দিলো ঘুম। আমি জানালা দিয়ে জোনাকির আলো দেখায় ব্যস্ত ছিলাম। ওর দিকে তাকাইওনি। রাস্তার ধারের সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো আবছা ঢুকছিল গাড়ির ভেতরে। সেই আলোয় ওকে দেখে তৃতীয় বার ওর প্রেমে পড়তে চাইনি। তানিয়ার ঘুম ভাঙল একেবারে বাড়িতে ফিরে। একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লেগেছিল আমার, আমাদের বাড়িতে ফিরেও সে কথা বলা বন্ধ করেনি। খাওয়ার সময় নিজে রুমে গিয়ে ডেকে আনতো আমাকে। আমি তবুও নিষ্প্রভ। চুপচাপ ওর কথা শুনে মাথা নাড়াতাম।

বিয়ের মাস খানেক কেটে গেল। কোনো কিছুই বদলাইনি। তানিয়া একটু আধটু কথা বলত। আমার মাঝে মাঝে কথা বলতে ইচ্ছে জাগলেও পরক্ষণেই তা দমিয়ে দিতাম। আগের মতোই আমি শোফায় ঘুমোতাম। তানিয়া বিছানায়। কাজ শেষে মাঝরাত পর্যন্ত আমি ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে রেখে উপন্যাস পড়তাম। জীবনের উপন্যাস। ড্রিম লাইটের হালকা আলোয় কোনো স্বপ্ন দেখা যেত না। ছোঁয়াও যেত না কোনো স্বপ্নকে। তবুও তার নাম ড্রিম লাইট। উপন্যাস শেষে লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়তাম।

একদিন দুপুর বেলা বাসায় কেউ ছিল না। আম্মা আর রাত্রি মামা বাড়ি গেছেন। সাফিন কলেজে। অফিস বন্ধ থাকায় শুধু আমি আর তানিয়া বাসায়। তানিয়া রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল। আমি রুমে বসে বসে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ করে মাথাটা গুলিয়ে এলো। চোখের সামনে সবকিছু যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেল। পেট গুলিয়ে বমি আসতে চাইল আমার। কোনো রকমে বেসিনের সামনে গিয়ে পানির কল ছেড়ে দিয়ে বমি করতে শুরু করলাম। অনুভব করলাম আমার নাক দিয়েও তরল কিছু বেরুচ্ছে। রান্না ঘর থেকে তানিয়া “সাজিদ! সাজিদ!” বলে দৌড়ে এলো। বহু কষ্টে চোখ খুলে দেখলাম, বেসিনের জল থকথকে লাল হয়ে আছে। আমি আসলে বমি করিনি। নাক-মুখ দিয়ে যা বের হয়েছিল সব রক্ত। ছোটোবেলা থেকেই, রক্ত দেখলে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি, হিমোফোবিয়া। বেসিনে এক সাথে এত রক্ত দেখে স্থির থাকতে পারলাম না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে।

প্রায় একদিন পর জ্ঞান ফিরেছিল। তানিয়াই নাকি নিয়ে এসেছিল হাসপাতালে। আম্মার মুখ দেখে বুঝেছিলাম গুরুতর কিছু। কিন্তু আমাকে চোখ খুলতে দেখেই উনি মিথ্যে হাসি দিলেন। তানিয়া বেডের পাশেই বসা ছিল। তার টানা টানা চোখ দুটো ফোলা। সে আমার জন্য না ঘুমিয়ে জেগে ছিল? আমি বোকা বোকা ভঙ্গিতে কেবিনের চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। তানিয়া নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। অদ্ভুত সেই চাহনি হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে সক্ষম। দুদিন পর হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলাম। কিন্তু কেউই বলল না, ‘আমার ঠিক কী হয়েছে?’

বাসায় ফিরে সেদিন রাতেও আমি শোফায় ঘুমিয়েছিলাম। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল আমার। আশ্চর্য এক জিনিস দেখতে পেলাম! তানিয়া মেঝেতে বসে শোফার হাতলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। চিমটি কেটে নিশ্চিত হলাম এটা স্বপ্ন নয় বাস্তব। পৃথিবী সব সৌন্দর্য্য এসে মিলিত হয়েছিল তানিয়ার ঘুমন্ত মুখটায়। টানা টানা চোখের ওপরে বাঁকানো ভ্রু। গোলাপি রঙের ওষ্ঠ্যযুগল। কপালে নেমে পড়া কয়েকটা চুল। এসব দেখে কেউই ঠিক থাকতে পারত না। আমিও তৃতীয় বারের মতো তানিয়ার প্রেমে পড়লাম। ওর ঘন নিশ্বাসের শব্দ মাতাল করে দিচ্ছিল আমাকে। হৃদয়ের গভীর সমুদ্রে তুলেছিল ঝড়।

সত্যি সত্যি বিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। শুধু আমার মনের না। সাথে তানিয়ার মনেরও। সেদিন থেকেই আমি ওর সাথে কথা বলা শুরু করেছিলাম। প্রকৃত স্বামী স্ত্রী হয়ে উঠার বৃথা চেষ্টা ছিল নাকি জানি না। তবে সেদিন থেকে আমি আর শোফায় ঘুমোয়নি। বিছানায় ঘুমোতাম দুজনে। সেদিন রাতেই তানিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
‘আমার অনেক বড়ো কোনো রোগ হইছে তাই না? আমি কি আর বেশি দিন বাঁচব না?’
তানিয়া অস্পষ্ট স্বরে উত্তর দিয়েছিল, ‘কিচ্ছু হয়নি তোমার। ঠিক হয়ে যাবে। এসব উল্টা পাল্টা কথা বলিয়ো না।’
জানতাম তানিয়া মিথ্যে বলেছিল।

তিন.

আমার কী হয়েছে এখনো জানতে পারিনি। জানার চেষ্টাও করিনি। শুধু জানি, আমার আর বেশিদিন সময় নেই। হয়তো আর একমাস, দু’মাস অথবা ছ’মাস। মাঝে মাঝে নাক-মুখ দিয়ে খুব রক্ত ঝরে। রক্ত দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আর ভয় পাই না রক্ত দেখে। তানিয়ার কান্না দেখে বুঝছি, মেয়েটা আমাকে করুণা করেনি। কোনো অজানা কারণে সত্যিই ভালোবেসেছে!

আস্তে আস্তে দিন গড়াচ্ছে। আমার অবস্থারও কোনো পরিবর্তন নেই। মাঝে মাঝে খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে তানিয়াকে অনন্তকাল ভালোবেসে যেতে। আমার ইচ্ছে ছিল সারাজীবন ওর মায়াবী মুখটা দেখে কাটিয়ে দেবার। তা হয়তো আর হবে না। ইদানীং আমরা দুজন অনেক রাত জাগি। দুজনের চোখের নিচেই কালো দাগ পড়েছে। মাঝরাতে ছাদে উঠে আকাশের তারা গুণি। খোলা জানালা দিয়ে জোছনার আলো এসে ঢোকে রুমের ভেতর। সেই সফেদ আলোর স্রোতে আমরা ভালোবাসার নৌকা ভাসাই। সারারাত একে অন্যকে জড়িয়ে রাখি ভালোবাসার উষ্ণতায়।

কদিন ধরে তানিয়ার ভেতরে আমরা নতুন একটা হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। আমি খুশি হলেও, তানিয়া আমার বুকে মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে। কারণ আমাদের সন্তানের মুখ দেখার সময় হয়তো আমি পাব না। মৃত্যুদূত যে আশেপাশে ঘুরোঘুরি করছে। আমি ওর পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বলি, ‘কেঁদো না, আমি আবার আসব আমাদের সন্তানের মাঝে।’ ও উল্টো কান্নার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ওপরের দিকে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে তীব্র স্বরে বলি, ‘হে দয়াময়, আমাকে আর ক’টা মাস সময় দেওয়া যায় না?’

রুমের ভেতর শেলফে আমার উপন্যাসের বইগুলো এখনো আছে। মাঝে মাঝে তানিয়া বইগুলো নিয়ে পড়ে। আমার মৃত্যু দিয়ে জীবন উপন্যাসের সমাপ্তি হবার কথা। কিন্তু আমি জানি তানিয়া তা হতে দেবে না। সে দীর্ঘায়িত করে যাবে উপন্যাসটা। তানিয়া ক্লান্ত হলে হয়তো আমাদের সন্তান দায়িত্ব নেবে, করে যাবে দীর্ঘায়িত করার কাজ। কিছু কিছু উপন্যাস যে বিবর্তনের কারণে শেষই হয় না।

‘বিবর্তন’ | © আবুল হাসনাত বাঁধন

(২১/০৯/২০১৫)
পাথরঘাটা, চট্টগ্রাম।

 

[কিওয়ার্ডস: বিবর্তন | আবুল হাসনাত বাঁধন, বিবর্তন : আবুল হাসনাত বাঁধন, বিবর্তন – আবুল হাসনাত বাঁধন, বিবর্তন, আবুল হাসনাত বাঁধন, ছোটোগল্প, গল্প, প্রেমের গল্প, রোমান্টিক গল্প, বিয়োগাত্মক গল্প, বিবর্তন গল্প, আবুল হাসনাত বাঁধন এর গল্প বিবর্তন, নন-ফিকশন]

Share With Love:

মন্তব্য করুন: